
নিজস্ব প্রতিনিধি :
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সম্পন্ন হওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অধ্যায় অতিক্রম করেছে। দীর্ঘদিনের মেরুকরণ, অংশগ্রহণ সংকট ও অবিশ্বাসের আবহ পেরিয়ে এই নির্বাচন ছিল আস্থার পুনর্গঠনের এক প্রয়াস। কিন্তু নির্বাচন কেবল সূচনা; গণতন্ত্রের প্রকৃত পরীক্ষা শুরু হয় নির্বাচনের পর- সংসদের ভেতরে। তাই এখন প্রধান প্রশ্ন: নির্বাচন পরবর্তী বাংলাদেশে সংসদ কি সত্যিই কার্যকর হবে?
নির্বাচন: আস্থার আংশিক পুনরুদ্ধার
নিবন্ধিত ৬০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৫১টির অংশগ্রহণ, ২৯৯টি আসনে ২ হাজারের বেশি প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং প্রায় ৫৯ শতাংশ ভোটার উপস্থিতি- এই পরিসংখ্যানগুলো একটি বহুমাত্রিক রাজনৈতিক বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটগ্রহণ এবং বড় ধরনের সহিংসতার অনুপস্থিতি একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এতে প্রমাণিত হয়েছে- প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা, নির্বাচন কমিশনের কার্যকর ভূমিকা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজন সম্ভব।
তবে নির্বাচনকে চূড়ান্ত অর্জন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি গণতন্ত্রের ভিত্তি, কিন্তু কাঠামো নয়। সেই কাঠামো নির্মিত হয় সংসদের কার্যকারিতা, নীতিনির্ধারণের মান এবং জবাবদিহির চর্চার মাধ্যমে।
প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন
এবারের নির্বাচনে নারী প্রার্থী ছিলেন মাত্র ৪ শতাংশের মতো। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণও সীমিত। অর্থাৎ নির্বাচনী প্রতিযোগিতা বিস্তৃত হলেও প্রতিনিধিত্বের গভীরে এখনো অসমতা রয়ে গেছে। কার্যকর সংসদ বলতে কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে আইন পাস নয়; বরং এমন একটি প্রতিনিধিত্বমূলক কাঠামো, যেখানে সমাজের বহুমাত্রিক বাস্তবতা প্রতিফলিত হয়।
রাজনৈতিক তাত্ত্বিক Robert A. Dahl তাঁর ‘পলিআর্কি’ ধারণায় প্রতিযোগিতা ও অংশগ্রহণকে কার্যকর গণতন্ত্রের মূল শর্ত হিসেবে দেখিয়েছেন। নির্বাচন প্রতিযোগিতার একটি ক্ষেত্র তৈরি করেছে, কিন্তু অংশগ্রহণের গুণগত বিস্তার- বিশেষত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তি- সংসদের ভেতরে নিশ্চিত করতে হবে।
সংসদের ভূমিকা: আইন প্রণয়ন না বিতর্কের মঞ্চ?
গণতন্ত্রে সংসদ কেবল আইন প্রণয়নের কারখানা নয়; এটি জনমতের প্রতিফলন ও নীতিগত বিতর্কের প্রধান মঞ্চ। অস্ট্রীয় অর্থনীতিবিদ Joseph Schumpeter নির্বাচনের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়াকে গণতন্ত্রের সারবস্তু হিসেবে দেখলেও আধুনিক গণতন্ত্রে সেই নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাজই গণতন্ত্রের মান নির্ধারণ করে।
বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে প্রায়ই দেখা গেছে- বিরোধী দলের অনুপস্থিতি বা কার্যকর ভূমিকার অভাব, হট্টগোল, বয়কট কিংবা সীমিত আলোচনার সংস্কৃতি। ফলে সংসদ অনেক সময় বাস্তব নীতিনির্ধারণের পরিবর্তে আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থেকেছে। এবার সেই চক্র ভাঙার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
কার্যকর সংসদ মানে-
* সংসদীয় কমিটিগুলোর সক্রিয়তা,
* বিল পর্যালোচনায় বিশদ আলোচনা,
* বিরোধী দলের প্রশ্ন ও প্রস্তাবের প্রতি সম্মান,
* এবং সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
সামাজিক চুক্তি ও বৈধতার প্রশ্ন
দার্শনিক John Locke সামাজিক চুক্তির তত্ত্বে বলেছিলেন, জনগণের সম্মতি ছাড়া শাসনের বৈধতা নেই। নির্বাচন সেই সম্মতির প্রকাশ। কিন্তু সম্মতি একবার অর্জিত হলেই তা স্থায়ী হয় না; এটি বজায় রাখতে হয় ন্যায়সংগত শাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মাধ্যমে।
সংসদ যদি কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয় এবং সংখ্যালঘু মতকে উপেক্ষা করে, তবে সেই সম্মতি ক্ষয়প্রাপ্ত হবে। কার্যকর সংসদ তাই সংখ্যার জোর নয়; বরং যুক্তির শক্তি ও আলোচনার সংস্কৃতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে।
জুলাই অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান রাষ্ট্রসংস্কার ও কার্যকর গণতন্ত্রের দাবিকে সামনে এনেছিল। প্রাণহানি ও আত্মত্যাগের সেই অধ্যায় জাতিকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। এবারের নির্বাচন সেই আন্দোলনের একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিফলন হলেও এর পূর্ণতা নির্ভর করছে সংসদের আচরণের ওপর।
যদি সংসদ জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী সংস্কার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়- নির্বাচনী কাঠামো, বিচারব্যবস্থা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও মানবাধিকার রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে- তবে অভ্যুত্থানের চেতনা বাস্তব রূপ পাবে। অন্যথায় নির্বাচন কেবল প্রতীকী অর্জনে সীমাবদ্ধ থাকবে।
ডিজিটাল যুগে সংসদ
এবারের নির্বাচনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক ব্যবহার নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। ভোটাররা সরাসরি প্রার্থীদের প্রশ্ন করেছেন, তথ্য যাচাই করেছেন এবং মত প্রকাশ করেছেন। এই ডিজিটাল অংশগ্রহণ সংসদের ওপরও চাপ সৃষ্টি করবে।
কার্যকর সংসদকে এখন কেবল ভেতরের আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা, সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দেওয়া এবং তথ্য উন্মুক্ত রাখা জরুরি। স্বচ্ছতা এখন রাজনৈতিক সংস্কৃতির অপরিহার্য অংশ।
প্রবাসী অংশগ্রহণ ও জাতীয় রাজনীতি
পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে প্রবাসীদের অংশগ্রহণ একটি তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ। প্রবাসীরা দীর্ঘদিন অর্থনৈতিক অবদানের জন্য স্বীকৃত হলেও রাজনৈতিক অংশগ্রহণে সীমাবদ্ধ ছিলেন। এখন তাদের প্রত্যাশা- নীতিনির্ধারণে প্রতিফলিত হবে। সংসদকে তাই বৈশ্বিক প্রবাসী বাস্তবতাকেও বিবেচনায় নিতে হবে।
সামনে যে চ্যালেঞ্জ
১. বিরোধী দলের কার্যকর উপস্থিতি: সংসদে শক্তিশালী ও দায়িত্বশীল বিরোধিতা ছাড়া জবাবদিহি সম্ভব নয়।
২. দলীয় শৃঙ্খলা বনাম মতপ্রকাশের স্বাধীনতা: দলীয় অবস্থান বজায় রেখেও সংসদ সদস্যদের স্বাধীন মতামতের সুযোগ থাকা প্রয়োজন।
৩. নীতিনির্ভর রাজনীতি: ব্যক্তিকেন্দ্রিক আক্রমণের বদলে নীতিগত বিতর্কের চর্চা স্থায়ী করতে হবে।
৪. প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তি: নারী ও সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে সাংগঠনিক ও আইনি উদ্যোগ জরুরি।
৫. গণভোটে প্রাপ্ত সংস্কার-সমর্থনের বাস্তবায়ন: সাংবিধানিক পরিবর্তনের প্রশ্নে আন্তরিক ও স্বচ্ছ উদ্যোগ প্রয়োজন।
উপসংহার: পরীক্ষার সময় এখন
নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশ এক সম্ভাবনার মুহূর্তে দাঁড়িয়ে। আস্থার যে আভাস তৈরি হয়েছে, তা রক্ষা করা এখন রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্ব। কার্যকর সংসদ গড়ে উঠলে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি পাবে; অন্যথায় আস্থার পুনর্গঠন আবারও ভঙ্গুর হয়ে পড়বে।
গণতন্ত্র কেবল ভোটের দিনেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া- যেখানে বিতর্ক, সমঝোতা, সমালোচনা ও সহযোগিতা একসঙ্গে চলে। সংসদ সেই প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দু। যদি নির্বাচিত প্রতিনিধিরা বিরোধিতাকে শত্রুতা নয়, বরং গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেন; যদি নীতিনির্ধারণ হয় তথ্যভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক; যদি জবাবদিহি হয় নিয়মিত ও কার্যকর- তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ সত্যিই একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা করতে পারবে।
অতএব প্রশ্নটি কেবল অলঙ্কার নয়- এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের নির্ণায়ক: নির্বাচন পরবর্তী বাংলাদেশে সংসদ কি হবে কার্যকর? উত্তরের দায়িত্ব এখন সংসদ সদস্যদের হাতে, এবং শেষ পর্যন্ত জনগণের রায়ের কাছেই তার জবাবদিহি নির্ধারিত হবে।
ডঃ এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
লেখক সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
।। প্রকাশক ও সম্পাদক : মো: শিহাব উদ্দিন ।। নির্বাহী সম্পাদক : জি.এস. জয় ।। বার্তা সম্পাদকঃ ইঞ্জিঃ আবু নাছের
দৈনিক জন জাগরণ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত@২০২৫You cannot copy content of this page