
নিজস্ব প্রতিনিধি :
দীর্ঘ সময় পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) আবার একটি পূর্ণাঙ্গ নির্বাচনী ইশতেহার জাতির সামনে তুলে ধরেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে প্রকাশিত এই ইশতেহার কেবল ভোটে প্রার্থিতা নয়; এটি দলটির রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন, বিকল্প রাষ্ট্রচিন্তা এবং দীর্ঘমেয়াদী সামাজিক ও অর্থনৈতিক নীতির একটি সংক্ষিপ্ত রূপরেখা হিসেবে পড়া যেতে পারে। বিশেষ করে এটি তারেক রহমানের নেতৃত্বে প্রকাশিত প্রথম ইশতেহার হওয়ায় রাজনৈতিক দিক থেকে তা অতীতের ইশতেহারের সঙ্গে তুলনায় আলাদা গুরুত্ব বহন করে।
বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে বিএনপি দীর্ঘ সময় বড় রাজনৈতিক শক্তি থাকা সত্ত্বেও সব নির্বাচনেই অংশ নেয়নি। ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন দলটি বর্জন করেছে। দীর্ঘ সময় ধরে সংসদ ও নির্বাচনের বাইরে থাকা একটি বড় দল আবার ভোট ও রাজনীতির মাঠে নিজেদের অবস্থান প্রমাণ করতে চাইলেই ইশতেহারের প্রকাশের তাৎপর্য স্পষ্ট। এটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কার্যকর গণতন্ত্রের জন্য বড় রাজনৈতিক দলগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য। তবে এখানে প্রশ্ন থেকে যায়- এই ইশতেহার কি কেবল রাজনৈতিক উপস্থিতি জানানোর মাধ্যম, নাকি এটি বাস্তবসম্মত, নির্ভরযোগ্য এবং গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার বিকল্প?
ইশতেহারকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিএনপি এটিকে পাঁচটি মূল ভাগে ভাগ করেছে- রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংস্কার, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও সামাজিক নিরাপত্তা, ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধার, অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়ন এবং ধর্ম, সংস্কৃতি ও সামাজিক সংহতি। এর মধ্যে রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংস্কার অংশটি সবচেয়ে বিস্তৃত এবং রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল।
রাষ্ট্র সংস্কারের মধ্যে বিএনপি আবারও তাদের দীর্ঘদিনের দাবি তুলে এনেছে- তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন, সংসদে উচ্চকক্ষ প্রবর্তন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমা নির্ধারণ, বিরোধীদলীয় ডেপুটি স্পিকার প্রবর্তন, প্রধান বিচারপতির জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে নিয়োগ, স্থানীয় সরকারকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ। এসব প্রস্তাব মূলত বাংলাদেশের ক্ষমতার কেন্দ্রিকীকরণ এবং নির্বাহী বিভাগের আধিপত্য নিয়ে দীর্ঘদিনের আলোচনার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।
তবে এই সংস্কারগুলো বাস্তবায়নের দিকটি ততটা স্পষ্ট নয়। সংবিধান সংশোধন এবং মৌলিক ক্ষমতার পরিবর্তনের জন্য রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রয়োজন। বিএনপি ইশতেহারে স্পষ্টভাবে বলেছে, তারা গণতন্ত্রের শক্তি পুনঃস্থাপন করতে চায়, তবে রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং ভিন্নমতের প্রতি সম্মান প্রদানের উপায়ে তারা কীভাবে কাজ করবে, তা বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়নি। এটি বোঝার জন্য নির্বাচনের পরকার রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।
ইশতেহারের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো- ২০২৪ সালের জুলাই-অগাস্টের গণ-অভ্যুত্থান এবং ‘ফ্যাসিস্ট আমলের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার’ প্রতিশ্রুতি। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আন্দোলন ও জনগণের অভিজ্ঞতাকে বিএনপি তাদের রাজনৈতিক বয়ানে অন্তর্ভুক্ত করেছে। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়; বরং এটি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস ও জনস্বার্থের প্রতি দায়বদ্ধতার ইঙ্গিত বহন করে। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, বিচার প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হবে। এটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার না হয়ে সত্যিকারের ন্যায়ের প্রক্রিয়া হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা অপরিহার্য।
আইডিয়োলজিক্যাল দিক থেকে বিএনপি সংবিধানে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ পুনঃস্থাপনের কথাও উল্লেখ করেছে। একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণ এবং তা ‘নিরপেক্ষভাবে’ দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও জনচেতনায় অন্তর্ভুক্ত করার অঙ্গীকার করেছে। এই দুটি বিষয় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে অত্যন্ত সংবেদনশীল। দলটির যুক্তি হলো, ধর্মীয় বিশ্বাস ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি কোনো এক দলের একচেটিয়া রাজনৈতিক হাতিয়ার হবে না, বরং জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় নীতির সঙ্গে সমন্বয় করে এগিয়ে যাবে। এটি বিভাজনের রাজনীতি নয়; বরং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রচিন্তার একটি পরীক্ষা।
অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রতিশ্রুতির দিক থেকে বিএনপির ইশতেহার উচ্চাকাঙ্ক্ষী। প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রদান করে মাসিক সহায়তা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা, নারীর নামে কার্ড প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত সামাজিক নিরাপত্তা ও নারীর ক্ষমতায়নকে প্রাধান্য দেয়। কৃষকদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’, কৃষিঋণ মওকুফ, বাজারজাতকরণে রাষ্ট্রীয় সহায়তা- এসব গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে নেওয়া পদক্ষেপ।
স্বাস্থ্য খাতে এক লাখ কর্মী নিয়োগ, শিক্ষায় মিড-ডে মিল, আইটি খাতে ১০ লাখ কর্মসংস্থান, বেকারভাতা ও পেনশন ফান্ড- এসব প্রতিশ্রুতি জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ। নারী ও প্রতিবন্ধীদের ক্ষেত্রে বৈষম্যহীন বেতন, মাতৃত্বকালীন ছুটি এবং প্রযুক্তি সহায়তা- এসব পদক্ষেপ সামাজিক ন্যায্যতার এক স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।
তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন থেকেই যায়- এই প্রতিশ্রুতিগুলোর অর্থায়ন কীভাবে হবে? দেশের অর্থনীতি বর্তমানে চাপে রয়েছে। মুদ্রাস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা- এসব বাস্তবতা বিবেচনা করলে অর্থায়নের বিস্তারিত রূপরেখা প্রয়োজন। তবে ইশতেহারের উদ্দেশ্যই মূলত একটি নীতিগত ও আদর্শগত দিক নির্দেশ করা। গুরুত্বপূর্ণ হলো, কোন খাতগুলোতে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, সেটি স্পষ্ট করা।
পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ে বিএনপি তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক। নদী ও খাল খনন, বৃক্ষরোপণ, থ্রি-আর নীতি বাস্তবায়ন, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা- এসব পদক্ষেপ পরিবেশ সচেতনতার দিক থেকে প্রাসঙ্গিক। তবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সুশাসন ছাড়া অতীতে এ ধরনের উদ্যোগ কাঙ্ক্ষিত ফল দেয়নি। ব্যাংকিং খাত ও স্বশস্ত্র বাহিনীকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত রাখার অঙ্গীকারও প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্বের বার্তা দেয়।
বিদেশনীতিতে সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রাখার সঙ্গে সবার সঙ্গে বন্ধুত্বের নীতি এবং নদীর পানিবণ্টন নিয়ে সমাধানের অঙ্গীকার বাস্তবসম্মত। বর্তমান আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাস্তবতায় সংঘাত নয়, আলোচনাই কার্যকর পথ- এই বার্তাও স্পষ্ট।
সব মিলিয়ে বিএনপির এই ইশতেহার এক বিস্তৃত রাজনৈতিক দলিল, যা রাষ্ট্র সংস্কার, সামাজিক নিরাপত্তা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি হাজির করেছে। এতে সব প্রশ্নের উত্তর নেই, সব পরিকল্পনার বিস্তারিত রূপরেখাও নেই। তবে দীর্ঘদিন পর একটি বড় রাজনৈতিক দল যে জনগণের সামনে শাসন ও সমাজচিন্তার বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছে, তা গুরুত্বপূর্ণ।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থাকে- এই ইশতেহার কি কেবল রাজনৈতিক উপস্থিতির কৌশল, নাকি সত্যিই ভিন্ন ধারার শাসনব্যবস্থার সূচনা? এই প্রশ্নের উত্তর দেবে সময়, রাজনৈতিক আচরণ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে জনগণের রায়। তবে এটুকু বলা যায়, বিএনপির এই ইশতেহার বাংলাদেশের রাজনীতিতে অর্থবহ আলোচনা, আশা এবং নতুন সমঝোতার দরজা খুলেছে।
ডঃ এ জেড এম মাইনুল ইসলাম
লেখক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট
।। প্রকাশক ও সম্পাদক : মো: শিহাব উদ্দিন ।। নির্বাহী সম্পাদক : জি.এস. জয় ।। বার্তা সম্পাদকঃ ইঞ্জিঃ আবু নাছের
দৈনিক জন জাগরণ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত@২০২৫You cannot copy content of this page