
সাইমন :
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশন (OHCHR) প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে একটি কার্যালয় চালু করতে যাচ্ছে। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে ৩ বছরের জন্য একটি মিশন চালুর লক্ষ্যে সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকার ও জাতিসংঘের মধ্যে সমঝোতা স্মারক (MoU) সই হয়েছে। পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনার ফলকার টুর্ক এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
জাতিসংঘের মানবাধিকার মিশন কী?
ওএইচসিএইচআর জাতিসংঘের একটি শীর্ষ সংস্থা, যা বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার রক্ষা, উন্নয়ন ও পর্যবেক্ষণের কাজ করে। ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থা জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের অধীনে কাজ করে এবং বিভিন্ন দেশে আইন, প্রশাসন ও নীতি বিষয়ে পরামর্শ এবং সহযোগিতা দেয়।
বাংলাদেশে কার্যালয় খোলার পেছনের কারণ
গত এক দশকে বাংলাদেশে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বাধা, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহারসহ নানা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। এসব নিয়ে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষণ ছিল স্পষ্ট।
বিশেষ করে সাম্প্রতিক নির্বাচন ও বিরোধী দলের ওপর দমনপীড়নের প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘ বাংলাদেশে একটি পর্যবেক্ষণমূলক ও সহায়ক কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। তাই আলোচনার ভিত্তিতে একটি সহানুভূতিশীল ও সহযোগিতামূলক মানবাধিকার কার্যালয় স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বাংলাদেশে কার্যালয়টি কীভাবে কাজ করবে?
জাতিসংঘের মতে, এই কার্যালয় সরকারের সঙ্গে সমন্বয়ে নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে মানবাধিকার উন্নয়ন ও সুরক্ষার লক্ষ্যে কাজ করবে। মূলত তিনটি ক্ষেত্রে কার্যক্রম চালাবে—
১. পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা:
মানবাধিকার আইন ও নীতিমালা সংস্কারে পরামর্শ দেওয়া
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিচার বিভাগের প্রশিক্ষণ
২. পর্যবেক্ষণ ও প্রতিবেদন:
দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়মিত মূল্যায়ন
জাতিসংঘে রিপোর্ট উপস্থাপন
৩. সচেতনতা ও অংশীদারিত্ব:
এনজিও, সিভিল সোসাইটি, গণমাধ্যম ও তরুণদের সঙ্গে কাজ
মানবাধিকার বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি
তবে, এই কার্যালয়ের কোনো আইন প্রয়োগকারী ক্ষমতা থাকবে না। এটি শুধুমাত্র পর্যবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ ও সুপারিশের মাধ্যমে কাজ করবে।
বিশ্বের কোথায় কোথায় আছে এমন কার্যালয়?
বর্তমানে ওএইচসিএইচআরের প্রায় ৯০টি কার্যালয় রয়েছে ৮০টির বেশি দেশে। এর মধ্যে রয়েছে আফগানিস্তান, কলম্বিয়া, সুদান, কঙ্গো, ফিলিপাইন, ইউক্রেন, সিরিয়াসহ অনেক সংঘাত বা রাজনৈতিক সংকটে থাকা দেশ।
বাংলাদেশে এটি হস্তক্ষেপ নাকি সহায়তা?
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি কোনো হস্তক্ষেপমূলক সংস্থা নয় বরং সরকারের অনুমোদিত একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান। সব কার্যক্রম সরকারের অনুমোদন সাপেক্ষেই পরিচালিত হবে। তবে সমালোচকরা মনে করেন, এটি একটি আন্তর্জাতিক নজরদারির ইঙ্গিত হতে পারে, যা বাংলাদেশ সরকারের মানবাধিকার চর্চায় দায়বদ্ধতা আরও বাড়াবে।
সমালোচনা ও উদ্বেগ
এই উদ্যোগ ঘিরে উদ্বেগ জানিয়েছে কিছু ধর্মীয় সংগঠন।
হেফাজতে ইসলাম বলেছে, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো পূর্বে ‘মানবাধিকারের’ নামে ইসলামী শরিয়াহ ও ধর্মীয় মূল্যবোধে হস্তক্ষেপের চেষ্টা করেছে। তাই তারা এই কার্যালয় স্থাপনে আপত্তি জানায়।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ দাবি করেছে, এই মিশন দীর্ঘমেয়াদে দেশের জন্য বিপদ ডেকে আনবে এবং সরকারের প্রতি আন্তর্জাতিক প্রভাব বাড়াবে।
সংক্ষিপ্তভাবে, এই কার্যালয়ের মূল উদ্দেশ্য হবে বাংলাদেশে মানবাধিকারের উন্নয়ন, আইনগত সংস্কার এবং নাগরিক সমাজের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করা—সরকারের সঙ্গে সমন্বয়ে, কিন্তু নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রেখে। তবে এটি বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক দৃষ্টিতে এক গুরুত্বপূর্ণ নজরদারি এবং রাজনৈতিক বার্তাও বয়ে আনছে।
।। প্রকাশক ও সম্পাদক : মো: শিহাব উদ্দিন ।। নির্বাহী সম্পাদক : জি.এস. জয় ।। বার্তা-সম্পাদকঃ আবু নাছের
দৈনিক জন জাগরণ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত@২০২৬You cannot copy content of this page